Posts

তাঁত শিল্পের আদি কথন

Image
সংস্কৃত ‘তন্তু’ থেকে বাংলা ‘তাঁত’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে বঙ্গীয় শব্দকোষ-এ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত তাঁতযন্ত্রের নানা রকম প্রকারভেদ আছে। যেমনপিট লুম বা গর্ত তাঁত, ফ্রেম লুম, চিত্তরঞ্জন বা জাপানি তাঁত, কোমর তাঁত ইত্যাদি। প্রাচীনতার দিক দিয়ে পিট লুম বা গর্ত তাঁতকে বাংলা অঞ্চলের আদি তাঁত বলা যেতে পারে। বাংলার বিখ্যাত মসলিন ও অন্যান্য বস্ত্র এই পিটলুম বা গর্ত তাঁতেই তৈরি হতো। সাধারণ বাঁশ, কাঠ ইত্যাদি সহজলভ্য জিনিস দিয়েই এই তাঁত তৈরি হতো। ঢাকার কাছে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে রূপগঞ্জ-সোনারগাঁ অঞ্চলে এখনো সাধারণ গর্ত তাঁতেই নকশাদার জামদানি শাড়ি বয়ন করা হয়। বাংলাদেশে ফ্রেম লুম, চিত্তরঞ্জন বা জাপানি তাঁত এবং সেই সঙ্গে ফ্লাই সাটল, ডবি বা জ্যার্কাড মেশিন ইত্যাদির প্রচলন ঘটেছে অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে।মোটামুটি বিশ শতকের প্রথমার্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বঙ্গীয় শিল্প ও কৃষি বিভাগের নানা তৎপরতায় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতযন্ত্রের আধুনিকায়ন ঘটেছে। শাড়ি তৈরির কৃৎকৌশলেও এই আধুনিকতার প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে নরসিংদী, টাঙ্গাইল কিংবা সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে...

Jamdani

Image
Page shop link: https://www.facebook.com/pg/sutak0/shop_nt/

জামদানির প্রকারভেদ

Image
জামদানি নকশার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক অলঙ্করণ। জামদানি নকশা বর্তমানের মত কাগজে এঁকে নেওয়া হতো না। দক্ষ কারিগর স্মৃতি থেকে কাপড়ে নকশা তুলতেন।  নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন জামদানি বিভিন্ন নামে পরিচিত, যেমন পান্না হাজার, দুবলি জাল, বুটিদার, তেরছা, জালার, ডুরিয়া, চারকোণা, ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, পুঁইলতা, কচুপাতা, কাটিহার, কলকা পাড়, আঙুরলতা, সন্দেশ পাড়, প্রজাপতি পাড়, দুর্বা পাড়, শাপলাফুল, বাঘনলি, জুঁইবুটি, শাল পাড়, চন্দ্র পাড়, চন্দ্রহার, হংস, ঝুমকা, কাউয়ার ঠ্যাঙা পাড়, চালতা পাড়, ইঞ্চি পাড় ও বিলাই আড়াকুল নকশা, কচুপাতা পাড়, বাড়গাট পাড়, করলাপাড়, গিলা পাড়, কলসফুল, মুরালি জাল, কচি পাড়, মিহিন পাড়, কাঁকড়া পাড়, শামুকবুটি, প্রজাপতি বুটি, বেলপাতা পাড়, জবাফুল, বাদুড় পাখি পাড় ইত্যাদি।  বর্তমানে শাড়ির জমিনে গোলাপফুল, জুঁইফুল, পদ্মফুল, কলারফানা, আদারফানা, সাবুদানা ইত্যাদি নকশা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ঐতিহ্যবাহী জামদানি নকশাকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস চলছে।  ছোট ছোট বিভিন্ন ফুলের বুটি তোলা জামদানি বুটিদার নামে পরিচিত। জামদানি বস্ত্রে ছোট ছোট ফুলগুলি যদি তেরছাভাবে সারিবদ...

জামদানির বুনন পদ্ধতি

Image
সাধারণত সুতা কাটার ওপর নির্ভর করত জামদানি মসলিনের সূক্ষ্মতা। সুতা কাটার উপযুক্ত সময় ভোরবেলা। কেননা তখন বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে। সুতা কাটার জন্য তাঁতিদের প্রয়োজন হতো টাকু, বাঁশের ঝুড়ি, শঙ্খ ও পাথরের বাটি। মাড় হিসেবে সাধারণত খই, ভাত বা বার্লি ব্যবহার করা হতো। জামদানি তৈরির আগে তাঁতিরা সুতায় মাড় ও রং করে নিতেন। রং হিসেবে বনজ ফলফুল - লতা - পাতার রং ব্যবহার করা হতো। ভাল জামদানির জন্য ২০০ থেকে ২৫০ নম্বরের সুতা ব্যবহূত হতো।   অবশ্য আজকাল তাঁতিরা বাজার থেকে নির্ধারিত কাউন্টের সুতা কিনে জামদানি তৈরি করেন এবং প্রাকৃতিক রঙের পাশাপাশি কৃত্ রিম রং ব্যবহার করে থাকেন।  জামদানি তৈরির ক্ষেত্রে প্রতি তাঁতে দুজন তাঁতি পাশাপাশি বসে কাজ করেন। দুটি সুচাকৃতি বাঁশের কাঠিতে নকশার সুতা জড়ানো থাকে। প্রয়োজনীয় স্থানে সুচ দুটি দিয়ে পরিমিত টানায় সুতার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রঙিন সুতা চালিয়ে দেওয়া হয়। এরপর পাশের সুতার মাকু একজন তাঁতি পাশ থেকে অন্য তাঁতির কাছে দিলে তা সেদিক থেকে বের করে দেওয়া হয়। এভাবে তাঁতে রেখে জামদানি নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। জমিনের সুতার তুলনায় নকশার সুতা মোটা হওয়...

জামদানির উৎপত্তি ও বিকাশ

Image
বাংলায়  বস্ত্রশিল্প এর প্রাচীনতম উল্লেখ পাওয়া যায় কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (আনু. ৩০০ খ্রি), চর্যাগীতির বিভিন্ন পংক্তি এবং প্লিনির রচনায়, খ্রিস্টীয় প্রথম দশকে রচিত পেরিপ্লাস অব দি এরিথ্রিয়ান সি গ্রন্থে এবং মার্কোপলো, ইবনে বতুতা, চীনা পরিব্রাজক ও ফরাসী রাষ্ট্রদূতের বর্ণনায়। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বঙ্গ ও পুন্ড্র এলাকায় তৈরি সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ আছে। বঙ্গ ও পুন্ড্রতে চার প্রকার বস্ত্রের প্রচলন ছিল ক্ষৌম, দুকূল, পত্রোর্ণ ও কার্পাসী।     চিত্র: নকশাদার জামদানি শাড়ি। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ, লোকমুখে প্রচলিত কাহিনী, শ্লোক, বিবরণ থেকে মনে হয় যে, খ্রিস্টপূর্ব প্রথম দশক থেকে বাংলায় সূক্ষ্ম মিহিবস্ত্র সমাদৃত হয়ে আসছিল। বাংলার কার্পাস বা কার্পাস বস্ত্রের বিকাশ ঘটেছে অনেক বিবর্তনের মাধ্যমে। দুকূল নামের বস্ত্রের ক্রমবিবর্তনই মসলিন। জামদানি নকশার প্রচলন ও মসলিনের বিকাশ পাশাপাশি শুরু হয়েছিল মনে হয়। উল্লেখ্য, ইরাকের বিখ্যাত ব্যবসায় কেন্দ্র মসুলে যে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো সেটিকে মসুলি বা মসুলিন বলা হতো। নবম শতাব্দীতে আরব ভূগোলবিদ সোলায়মানের স্রিল সিলাত-উত-তওয়ারিখে উল্লেখিত র...

নারায়ণগঞ্জের জামদানির ইতিহাস

Image
প্রাচীনকালে তাঁত বুনন প্রক্রিয়ায় কার্পাশ তুলার সুতা দিয়ে   মসলিন  নামে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরি হতো এবং মসলিনের উপর যে জ্যামিতিক নকশাদার বা বুটিদার বস্ত্র বোনা হতো তারই নাম জামদানি। জামদানি বলতে সাধারণত   শাড়ি  বোঝানো হলেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশায় সমৃদ্ধ ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, ঘাগরা, রুমাল, পর্দা, টেবিল ক্লথ সবই জামদানির আওতায় পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দীতে জামদানি নকশার কুর্তা ও শেরওয়ানির ব্যবহার ছিল। মুগল আমলের শেষের দিকে নেপালে ব্যবহৃত আঞ্চলিক পোশাক রাঙ্গা-র জন্য বিশেষ ধরনের জামদানি কাপড় তৈরি হতো।   জামদানির নামকরণ বিষয়ে সঠিক কিছু জানা নেই। তোফায়েল আহমদ (১৯৬৪)-এর মতে ফারসি শব্দ জামা মানে কাপড়, দানা অর্থ বুটি; অর্থাৎ জামদানি অর্থ বুটিদার কাপড়। সম্ভবত মুসলমানরাই জামদানির প্রচলন করেন এবং দীর্ঘদিন তাদের হাতেই এ শিল্প একচেটিয়াভাবে সীমাবদ্ধ থাকে। ফারসি থেকেই জামদানি নামের উৎপত্তি বলে অনুমান করা হয়।

বাংলার শিল্পে জামদানির অবস্থান

Image
জামদানি মূলত ইতিহাসখ্যাত সেই ঢাকাই শাড়ি মসলিনেরই একটি প্রজাতি। ঢাকাই মসলিনের পরই ছিল ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ির সুনাম। পৃথিবীজুড়ে জামদানি শাড়ির গ্রহণযোগ্যতা সর্বজনস্বীকৃত। এটি একান্তভাবে ঢাকার নিজস্ব কাঁচামালে তৈরি এবং ঢাকার তাঁত শিল্পীদের মৌলিক শিল্পবোধ এবং ধ্যান-ধারণার সৃষ্টি। অন‍্য কোনো দেশে এর কাঁচামাল এবং বুনন ক‍ৌশল খুঁজে পাওয়া দ্বায়। জামদানি শিল্প বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটা আমাদের ঐতিহ্য ও অহঙ্কার। রেশম, সুতা, জরি এবং শিল্পীর হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি জামদানি শাড়ি প্রাচীনকালের মসলিন কাপড়ের উত্তরাধিকারী হিসেবে বাঙালি নারীদের অতি প্রিয়। বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে ইতোমধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে জামদানি। তবে জামদানি কারিগরদের অভিযোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, কাঁচামাল ও উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি, দেশি কাপড়ের বাজার তৈরিতে সংকট, নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রচালিত তাঁতের সঙ্গে সক্ষমতায় পেরে না ওঠা, বিপণন ব্যর্থতা ও পুঁজিসংকটে ধুঁকে ধুঁকে চলছে সম্ভাবনাময় এ পণ্যটি। অথচ অভিজ্ঞজনদের মতে, জামদানি ও তাঁত শাড়িরতে বৈচিত্র্য এনে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জ...